লা পেন জিততেই পারেন!

ফ্রান্সের মেরিন লা পেনের অতি ডানপন্থী দল ফ্রন্ট ন্যাশনাল কখনোই ক্ষমতার এত কাছাকাছি যায়নি। আমি এটা বলছি না যে তিনি আগামী মে মাসে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন। ১৯৬২ সালে শার্ল দ্য গল যখন ফ্রান্সে প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচনের ব্যবস্থা প্রণয়ন করেন, তখন তিনি দুই স্তরে ভোট গ্রহণের কথা বলেছিলেন, যেখানে ৫০ শতাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন হবে। মনে হচ্ছে, লা পেন প্রথম বাধা পেরিয়ে গেলেও দ্বিতীয় বাধা পেরোতে পারবেন না। তিনি প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে ঢুকবেন—এটা বড় বিপদ নয়, বড় বিপদ হচ্ছে, তাঁর দল হয়তো সংসদের বৃহত্তম বিরোধী দল হবে। তবে পাঠক ভুল করবেন না, সবচেয়ে খারাপ ব্যাপারটাও ঘটতে পারে। সত্য হচ্ছে, ফ্রান্সে অতি ডানপন্থী দলের কেউ প্রেসিডেন্ট হবেন—এই ব্যাপারটা এখন আর ট্যাবু বা নিষিদ্ধ বিষয় নয়। 
ভোটারদের কম উপস্থিতি, রাজনৈতিক মেরুকরণ, অধিকতর কেলেঙ্কারি বা আরও খারাপের মধ্যে সহিংসতা হতে পারে, যার কারণে মেরিন লা পেন জিতে যেতে পারেন। ব্রেক্সিট ও ট্রাম্পের নির্বাচিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিত মাথায় রাখাটাই কাঁপুনি ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। মনে রাখবেন, ব্রিটেনের যে মানুষেরা ইউনিয়নে থেকে যেতে চেয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে কিন্তু অতটা উচ্ছ্বাস ছিল না, যতটা ছিল ত্যাগপন্থীদের মধ্যে। ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার রাজনীতিকেরা তাঁদের দেশে বিদেশি ভীতি ছড়ানো লোকরঞ্জনবাদীদের বিকশিত হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। তাঁরা তাঁদের যথেষ্ট আত্মসন্তুষ্ট হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন, যদি তাঁদের দুষ্কর্মে সহযোগিতা না-ও করে থাকেন। ফ্রান্সের অতি ডানপন্থীরাও একই কারণে হালে পানি পেয়ে যাচ্ছেন। তাঁরা জানেন, সামগ্রিকভাবে রাজনৈতিক চিন্তার লড়াইটা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে হয়ে থাকে। অর্থাৎ গ্রামসি যা বলে থাকেন। রাজনৈতিক লড়াইটা শুধু প্রতিষ্ঠানের মধ্যে হয় না; আমরা যে ভাষা ব্যবহার করি, যে গল্প বলি বা মনে যে চিত্রকল্প সৃজন করি, তার মধ্যেও এই লড়াই হয়। অভিবাসন ও শরণার্থীরা সমস্যা বা ধর্মনিরপেক্ষতা ইসলামের উপস্থিতির কারণে হুমকির মুখে পড়েছে—এসব কথা বলা আজকের ফ্রান্সে একদম সাধারণ ব্যাপার হয়ে গেছে। সম্প্রতি ফ্রান্স ডান দিকে ঝুঁকে পড়েছে, যেখানে লা পেনের চিন্তা ডানপন্থীদের ছিনতাই করে নিয়েছে।
অন্যদিকে সমাজতন্ত্রীরা বিভক্ত হয়ে পড়েছেন, তাঁরা বিশৃঙ্খল। আর বিপ্লবী বামপন্থীরা বিশ্বায়ন ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে উদ্ভটভাবে লা পেনের সুরে কথা বলছেন। অন্যদিকে নাগরিকদের দুই অংশ ‘জনগণ’ ও ‘অভিজাতদের’ দ্বৈরথ সম্পর্কেও তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অভিন্ন, যার মধ্যে লোকরঞ্জনবাদের উপাদান আছে। লা পেন যদি নির্বাচনী লড়াইয়ে পরাজিত হন (বর্তমান জরিপে মনে হচ্ছে), তাহলে ডেমোক্র্যাটরা হয়তো ক্ষণিকের জন্য স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারবেন। কারণ, এক মাস পরেই ফ্রন্ট ন্যাশনাল সদলবলে সংসদে প্রবেশ করবে। তখন ফ্রান্সকে ইউরোপের অসুস্থ মানুষ মনে হবে। এর পরিণতি হবে মারাত্মক, যার প্রভাব সীমান্তের বহু দূরেও অনুভূত হবে। ফ্রান্স ইউরোপীয় প্রকল্পের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, যারা ইউরোজোনের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। তাদের সামরিক বাহিনী ইউরোপের বৃহত্তম। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যও সে। ফ্রান্স পশ্চিমের একটি খুঁটি। এখন লা পেন যদি দেশটির রাজনৈতিক রন্ধ্রে ঢুকে যান, তাহলে দেশটি অনুদার হওয়ার দ্বারপ্রান্তে চলে যাবে। দেশটির অর্থনীতি বেকারত্ব ও সংস্কারহীনতায় মুখ থুবড়ে পড়বে। অসহিষ্ণুতা ও বিভাজনের কারণে তার সামাজিক সংহতি বিপন্ন হবে। এতে দেশটির জনগণ প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে উঠবে।
সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্সের আর কোনো নির্বাচন মূলধারার রাজনৈতিক দলের জন্য এতটা অনিশ্চিত ছিল না। তারা কখনোই এতটা সন্ত্রস্ত হয়নি। ভুলগুলো এত গভীর যে সেগুলো এখন লুকানো যাবে না: কল্যাণমূলক রাষ্ট্র, শ্রমবাজার, ইউরোপ, বিশ্বায়ন প্রভৃতি বিষয়ক। সব পুরোনো কাঠামো ভেঙে পড়ছে, সবাই যেন চরমপন্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই পরিপ্রেক্ষিতেই ‘পেনেলোপে গেট’ কেলেঙ্কারি হয়েছিল, যা ফ্রাঁসোয়া ফিলনকে প্রায় গ্রাস করতে বসেছিল। তিনি তখন ছিলেন একজন ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী, যখন তাঁর বিরুদ্ধে সংসদের অর্থ অপব্যবহারের অভিযোগ তদন্ত হচ্ছিল। দেখা গেল, তিনি মরিয়া হয়ে কট্টর অবস্থান নিলেন। আজকের লা পেনের পরিচয়ের রাজনীতির কাছাকাছি কিছু একটা নিয়ে তিনি লীলা করতে শুরু করেন। কিন্তু এর মাধ্যমে তিনি নিজের লোকরঞ্জনবাদিতাকে বৈধতা দেন। অর্থাৎ ফ্রান্সের ডানপন্থী রাজনীতির ইতিহাস কিন্তু এ রকম বিষাক্ত বায়ুতে সঞ্জীবিত। গত রোববার প্যারিসের রাস্তায় সেই ১৯৩০-এর দশকের ফিলনের নির্বাচনী মিছিলের আবহ ফিরে এসেছিল। অতি রক্ষণশীল ক্যাথলিকেরা প্রথম দিকে একে বিচারক ও গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে জনগণের বিদ্রোহ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। তবে ফিলন বক্তৃতার সময় শেষমেশ গণতন্ত্রবিরোধী বাগাড়ম্বর থেকে সরে আসেন। তবে তিনি যে হিস্টেরিয়া সৃষ্টি করেছিলেন তাতে তাঁর রক্ষা হয়নি (বস্তুত,
তাঁর নির্বাচনের ফলাফল আরও খারাপ হয়)। তবে লা পেন এখন লাভবান হওয়ার পথে আছেন। তিনি বক্তৃতাবাগীশ রাজনীতির পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। এসবের ফল হচ্ছে, বেশির ভাগ ফরাসি ডেমোক্র্যাট সম্প্রতি ৩৯ বছর বয়সী সাবেক অর্থমন্ত্রী ইমানুয়েল ম্যাক্রনের ওপর ভরসা রেখেছেন (প্রথম দফা নির্বাচনের জরিপে তাঁর অবস্থান এখন লা পেনের পরেই)। তারুণ্য, আশাবাদ, সংস্কার, বৈচিত্র্য ও ইউরোপীয় প্রকল্প অন্তরে ধারণ—এসব কারণে তাঁর ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে। তিনি হয়তো এখন অন্ধকারের শক্তিকে প্রতিহত করতে পারবেন। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক ভিত্তি দুর্বল, যেখানে লা পেনের ভিত্তি বেশ শক্তিশালী। ইউরোপ ও ফ্রান্সের গণতন্ত্র ঝুঁকির মুখে—এ কথা বলা নিশ্চয়ই অত্যুক্তি হবে না। ১৯৪০ সালের বই দ্য স্ট্রেঞ্জ ডিফিট-এ ইতিহাসবিদ মার্ক ব্লচ ফ্রান্সের তৃতীয় প্রজাতন্ত্রের পতনের কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। এটা নতুন করে পড়া দরকার। ব্লচ লিখেছেন, এখন কেউ কাউকে বোঝায় না, তার বদলে আবেগপ্রবণ পরামর্শ দেয়। ওই যুগের সহিংস রাজনৈতিক আবেগের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেছেন। ফ্রান্স আজ অংশত একই রকম সংকটের মুখে পড়েছে। ডেমোক্র্যাটরা উদ্বেগভরে ব্যাপারটা খেয়াল করছেন। তবে তাঁদের উদ্বিগ্ন হওয়াটা ঠিকই আছে।
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন, ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া।
নাতালি নুগারেদ: ফরাসি কলামিস্ট।
Share on Google Plus

প্রতিবেদনটি পোষ্ট করেছেন: Sadia Afroza

a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকেলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা। বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকেলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন বা আর্কাইভ তৈরীর জন্য এই নিউজ ব্লগ। এর নিউজ বা আর্টিকেল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহকরে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল।
    Blogger Comment
    Facebook Comment

0 comments :

Post a Comment