অস্পষ্ট পররাষ্ট্রনীতি ও এর বৈশ্বিক প্রভাব

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি কী? অস্থিতিশীল বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গির কাঠামো বা ফ্রেমওয়ার্ক কি সুস্পষ্টভাবে জানা গেছে? যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে দীর্ঘ যুদ্ধের ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বা তাঁর মন্ত্রিসভার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন কি কোনো বক্তব্য দিয়েছেন? প্রতিবেশী মেক্সিকোর সঙ্গে সীমান্তদেয়াল তোলা ছাড়া লাতিন আমেরিকার বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কি কোনো অবস্থান রয়েছে? আপাতদৃষ্টে এসব প্রশ্নকে সরল, এমনকি অতি সরল বলে মনে হলেও এ প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর আসলেই পাওয়া যাচ্ছে না। প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার ৪৫ দিন পার হয়ে গেলেও এবং কংগ্রেসের যুক্ত অধিবেশনে এক ঘণ্টার বক্তৃতা দেওয়া সত্ত্বেও এসব প্রশ্নের সরকারি উত্তর নেই। উত্তর হিসেবে গণমাধ্যমে যা পাওয়া যাচ্ছে, তা বিশ্লেষকদের ধারণা বা অনুমান—বড়জোর ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণার সময়ে দেওয়া বক্তব্যেরই পরিবর্ধিত সংস্করণ। নিকট অতীতে এমন ঘটনা ঘটেছে বলে কারও স্মরণে আসে না। কংগ্রেসে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প যখন বলেন, ‘আমার কাজ পৃথিবীকে প্রতিনিধিত্ব করা নয়, আমার কাজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিনিধিত্ব করা’, তখন বোঝা যায় যে তিনি নির্বাচনী প্রচারাভিযানের সময় যে ‘একলা চলার নীতি’র কথা বলেছিলেন, সেটাই পুনর্ব্যক্ত করলেন। কিন্তু তাঁর কর্মকাঠামো কী হবে, সেটার ইঙ্গিত এই বক্তৃতায় পাওয়া যায় না। শুধু তা-ই নয়, ২০ জানুয়ারির পর থেকে ট্রাম্প এবং তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যরা পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্যও দিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিজের অবস্থানের ক্ষেত্রেও এই স্ববিরোধিতা লক্ষ করা গেছে। বৈশ্বিক রাজনীতিতে কোনো দেশের সুস্পষ্ট নীতি ও অবস্থানের যেমন প্রভাব থাকে, তেমনি তার অনুপস্থিতিরও প্রভাব পড়ে। এটি বিশেষ করে সেই সব রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যেগুলো রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে শক্তিশালী। সেই দিক থেকে আমাদের প্রথমেই দেখা দরকার যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কী—বৈশ্বিক জিডিপির ২৪ দশমিক ৭ শতাংশ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের। তার পরে আছে চীন,
যার অংশ হচ্ছে ১৫ দশমিক ১ শতাংশ। সামরিক শক্তির দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান শীর্ষে। মোট বাজেট বরাদ্দ হচ্ছে ৫৯৬ বিলিয়ন ডলার, যা পরবর্তী সাতটি দেশ—চীন, সৌদি আরব, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ভারত, ফ্রান্স ও জাপানের সম্মিলিত ব্যয় ৫৬৭ বিলিয়নের চেয়ে বেশি। ২০১৫ সালের আগস্ট মাসে পলিটিকোতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে ডেভিড ভাইন দেখিয়েছিলেন যে পৃথিবীর ৭০টি দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি আছে ৮০০। প্রত্যক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্র একাধিক সংঘাতে জড়িত রয়েছে। এর মধ্যে আফগানিস্তানের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সংযুক্তি ইতিহাসের দীর্ঘতম। ইরাকেও যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যরা উপস্থিত আছে। সরকারি হিসাবে সাড়ে ১৩ হাজার মার্কিন সৈন্য ‘ওয়ার জোন’ বা যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছে। উল্লেখ্য, দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ৯ হাজার ৫০০-এর বেশি সৈন্য রয়েছে। বৈশ্বিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব আগের তুলনায় হ্রাস পেলেও জাতিসংঘসহ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে তার প্রভাব এখনো অন্যদের চেয়ে বেশি, আর্থিক কারণে ওই সব প্রতিষ্ঠানের যুক্তরাষ্ট্র-নির্ভরতাও বেশি। এর বাইরেও পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—যুক্তরাষ্ট্র কোন ধরনের জোটের সঙ্গে যুক্ত, কারা তার মিত্র, অন্য দেশগুলোর সঙ্গে তার সম্পর্ক কী। পররাষ্ট্রনীতি যেমন একটি দেশের প্রতিরক্ষানীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, তেমনি সংশ্লিষ্ট তার বাণিজ্যনীতির সঙ্গেও। এতটা গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের নীরবতা বিস্ময়কর। ফলে আমাদের নির্ভর করতে হবে আকার-ইঙ্গিতের ওপরই। জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে সাতটি মুসলিমপ্রধান দেশ থেকে যাতায়াতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ আদালতে স্থগিত হয়ে গেলেও তা সংশোধিতভাবে আবারও জারি করা হয়েছে সোমবার, যাতে ইরাককে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপে স্পষ্ট যে ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কিছু দেশের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসন বৈরিতার পথই বেছে নিয়েছে।
উপরন্তু আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রপন্থাকে ‘র‍্যাডিক্যাল ইসলামিক টেররিজম’ বলে চিহ্নিত করার মাধ্যমে তিনি মুসলিম জনগোষ্ঠীর সঙ্গে একধরনের দূরত্বই শুধু তৈরি করছেন না, সন্ত্রাসীদের হাতে প্রচারের অস্ত্রও তুলে দিচ্ছেন। ২০১৭ সালে প্রতিশ্রুতির চেয়ে কম শরণার্থী গ্রহণের সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিকভাবে যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, সেগুলো পুনর্বিবেচনার নামান্তর। একইভাবে আমরা জলবায়ু চুক্তির বিষয়টিকেও দেখতে পারি, কেননা জলবায়ুবিষয়ক জাতিসংঘের সংস্থা ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জের নির্বাহী সেক্রেটারি প্যাট্রিসিয়া এস্পিনোজা জানিয়েছেন, তিনি রেক্স টিলারসনের সঙ্গে বৈঠক করতে চেয়েছিলেন কিন্তু তাঁর পক্ষ থেকে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (টিপিপি) থেকে প্রত্যাহার কেবল বাণিজ্যিক জাতীয়তাবাদের ইঙ্গিত নয়, অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রভাব বিস্তারের জন্য সফট পাওয়ারের চেয়ে হার্ড পাওয়ারের দিকেই ঝুঁকে পড়ছে বলে মনে হয়। এসব ঘটনার পাশাপাশি আমরা দেখি যে নির্বাচনের পর এখন পর্যন্ত পররাষ্ট্র দপ্তর কোনো প্রেস ব্রিফিং করেনি, যা হওয়ার কথা প্রতিদিন। ১৯৫০ সালের পর এত দীর্ঘ সময় ব্রিফিং বন্ধ ছিল না। গত সপ্তাহে পররাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকে মানবাধিকার–বিষয়ক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন অনুপস্থিত ছিলেন, যা থেকে বোঝা যায় যে মানবাধিকারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এত দিনের অবস্থানে সম্ভবত পরিবর্তন আসছে; এ বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসন খুব বেশি উৎসাহী নয় বলেই ধারণা। রাশিয়া বা এ ধরনের দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কথা বলার পাশাপাশি মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনার জায়গা সীমিত হয়ে আসে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমন ধারণা দেওয়া হচ্ছে যে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল ত্যাগের কথা সক্রিয়ভাবে ভাবা হচ্ছে।
জাতিসংঘের প্রধান আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী টিলারসনের কোনো বৈঠক হয়নি; গত মাসে জার্মানির বন শহরে জি-২০-এর বৈঠকের পাশাপাশি তাঁদের বৈঠকের প্রস্তাব টিলারসনের পক্ষ থেকেই এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। জেনেভা থেকে বিবিসির সংবাদদাতা ইমুজিন ফুকস ২৭ ফেব্রুয়ারি এক প্রতিবেদনে জানান, কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডের রাজধানী বলে বিবেচিত জেনেভায় মার্কিন কূটনীতিকেরা অনুপস্থিত। ফলে কূটনীতি ট্রাম্প প্রশাসনের অগ্রাধিকার তালিকায় আছে, এমন মনে হয় না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কংগ্রেসে যে বাজেট প্রস্তাব পাঠাবেন, তাতে পররাষ্ট্র দপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিভাগ যেমন ইউএসএআইডির বাজেট কমানো হবে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ, অন্য পক্ষে প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়বে ১০ শতাংশ—কমপক্ষে ৫৪ বিলিয়ন ডলার। কূটনীতি, মানবিক সাহায্য ও উন্নয়নপ্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের চেয়ে শক্তি প্রদর্শনই এই প্রশাসনের নীতি বলে আমরা ধরে নিতে পারি। একদিকে একলা চলো বলে বিশ্বের বহুজাতিক সংস্থাগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্র দূরে সরে থাকছে, অন্যদিকে সামরিক শক্তি আরও বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে এই শূন্যতার একটা বড় কারণ হচ্ছে, ট্রাম্পের রাশিয়াবিষয়ক জটিলতা। রাশিয়ার সঙ্গে তাঁর নির্বাচনী প্রচার দলের যোগাযোগের বিষয়টি এখন কেবল সন্দেহের বিষয়ে সীমিত নেই, ইতিমধ্যেই আইনমন্ত্রী জেফ সেশনসহ অনেকেরই রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে যোগাযোগের প্রমাণ মিলেছে। এ নিয়ে রিপাবলিকান পার্টির কোনো কোনো নেতা আনুষ্ঠানিক তদন্তের দাবিতে ডেমোক্র্যাটদের সুরে কথা বলতে শুরু করেছেন। কংগ্রেসের সামনে এটা নিয়ে সেশনের বক্তব্য ‘মিথ্যাচার’ কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে। এসব বিতর্কের মধ্যেই ট্রাম্প কোনো রকম প্রমাণ ছাড়াই সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামার বিরুদ্ধে আইনভঙ্গের অভিযোগ তুলেছেন, যা এমনকি এফবিআইপ্রধান পর্যন্ত সঠিক নয় বলেই বলেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি–বিষয়ক শূন্যতার প্রতিক্রিয়া কেবল যে যুক্তরাষ্ট্রের ওপরই পড়ছে তা নয়, তার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে অন্য দেশগুলোর ওপরও—ন্যাটোবিষয়ক পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ও অবস্থানের কারণে ইউরোপের দেশগুলোই কেবল সংশয়ে আছে তা নয়, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো তাদের নিরাপত্তা নিয়েও চিন্তিত। কেননা, ন্যাটো এবং যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বল অবস্থানের সুযোগে রাশিয়া তাদের ওপর চাপ সৃষ্টির সুযোগ পাচ্ছে। অন্যদিকে এশিয়ায় চীনের প্রভাববলয় বৃদ্ধির যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা কেবল অর্থনৈতিক নয়, সামরিকও বটে। বিভিন্ন অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি বা সংশ্লিষ্টতা যে সব সময়ই ইতিবাচক হয়েছে, এমন যেমন দাবি করা যাবে না, তেমনি কোনো অঞ্চলে এককভাবে বড় একটি শক্তির একচ্ছত্র আধিপত্যও ছোট দেশগুলোর জন্য কোনো ইতিবাচক কিছু নয়, সেটাও মনে রাখা দরকার।
বৈশ্বিক শক্তিগুলোর মধ্যে এক দশকের বেশি সময় ধরে প্রভাববলয় বাড়ানোর যে প্রতিযোগিতা চলছে, সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্র তাকে সরিয়ে রাখতে চায় কি না, সেটাই বোঝার জন্য দরকার একটি সুস্পষ্ট পররাষ্ট্রনীতি, যা ট্রাম্প প্রশাসন এখনো তুলে ধরেনি। এই শূন্যতার ফলে আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজ নিজ অঞ্চলে তাদের আধিপত্য বাড়াতে পদক্ষেপ নেবে। ইতিমধ্যেই আমরা বিভিন্ন অঞ্চলে তার লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি। সিরিয়াকে কেন্দ্র করে ইরান-তুরস্ক-সৌদি আরবের আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় চীন ও ভারতের দ্বন্দ্ব এবং রাশিয়ার প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা সহজেই চোখে পড়ে। আফগানিস্তানে সম্প্রতি চীনা সৈন্যদের উপস্থিতির যে খবর বেরিয়েছে, তাকে চীন ‘মহড়ার অংশ’ বলে বর্ণনা করলেও অনেকেই একে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বাড়ানোর চীনের বর্তমান নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই মনে করেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগে ভারত এই অঞ্চলে, বিশেষত প্রতিবেশী বাংলাদেশ ও নেপালের ওপর রাজনৈতিক এবং সামরিক প্রভাব বৃদ্ধির জন্য উদ্যোগী হয়ে উঠেছে। বৈশ্বিক রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য না থাকলে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর পক্ষে এ ধরনের চাপ সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হয়। (শেষ)
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।
Share on Google Plus

About Sadia Afroza

    Blogger Comment
    Facebook Comment

0 comments:

Post a Comment